‘বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সাথে তুলনীয় সম্মানী প্রদান করছে।’ বললেন আলি যাকের, প্রধান নির্বাহী অফিসার ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এশিয়াটিক এমসিএল।
‘আমি ভারতের একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় মাত্র ৫,০০০ রুপী পারিশ্রমিক নিয়ে আমার ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম।’ বললেন গাউসুল আলম শাওন, জেনারেল ম্যানেজার, গ্রে, ঢাকা। কিন্তু তারপর ইউনিট্রেন্ড লিঃ-এ মাত্র ১২,০০০ টাকায় চাকরি বেছে নিলাম। তারপর এক সময় এশিয়াটিক হয়ে গ্রে’তে চাকরি নিলাম। আজ আমি পারফর্মেন্স দ্বারা গ্রে’র প্রধান হিসেবে কাজ করছি। সুতরাং বিজ্ঞাপনী সংস্থায় আমি মনে করি পারফর্মেন্সের মূল্যায়ন আছে।’
আসলেও কিন্তু তাই। আজ দেশের বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর ‘ক্রমবর্ধন বা গ্রোথ’ ভাল। এসব শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞাপনী সংস্থা থেকে অনেক ভাল ভাল কাজ বেরিয়ে আসছে। দেশী ও বহুজাতিক উভয় প্রকার ক্লায়েন্টই উৎকৃষ্ট মানের কাজ প্রত্যাশা করে এশিয়াটিক, বিটপী, ইউনিট্রেন্ড, গ্রে বাংলাদেশ, ওগিলভী এন্ড ম্যাথার, এডকম, ক্যারটকম, এক্সপ্রেশন্স বিডি প্রমুখ বিজ্ঞাপনী সংস্থার কাছ থেকে। আর এসব কাজ বের হতে পারে সৃজনশীল ও তুখোড় মেধাবী সেইসব বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের কাছ থেকে, যারা কিনা বোঝে বর্তমান বাজারের অবস্থা, ক্রেতার চাহিদা এবং তার সাথে সমম্বয় করতে পারে যুগের চাহিদানুযায়ী সৃষ্টিশীল কোন স্কিপ্ট বা কপিকে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন তৈরি সফল করার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত স্কিপ্ট, যা কিনা এমন একজনের কাছ থেকে বা একটি টিম ওয়ার্কের মাধ্যমে বের হতে পারে যারা বাজারের চাহিদানুযায়ী সৃষ্টিশীলভাবে ‘ক্লায়েন্টদের সাথে যোগাযোগ ও গণসংযোগ’ করতে পারে। যোগাযোগ করতে পারাটাই একজন অ্যাড স্কিপ্ট বা কপি রাইটারের মূল সাফল্য, সেখানে একটা অ্যাড করা হল যা খুব ‘ক্রিয়েটিভ’, কিন্তু গ্রাহকদের সাথে বা ভোক্তাদের সাথে যদি তা যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই অ্যাডের স্থান হওয়া উচিত আর্ট গ্যালারিতে, কোন মিডিয়াতে নয়। আর এই জন্য অ্যাড ফার্মগুলো যে সব সময়, ‘ফাইল আর্টস’ ব্যাকগ্রাউন্ডের লোক খোঁজে তা নয়, তারা চায় এমন একজন মানুষ, যে কিনা বাজারের অবস্থা ও বাজারে পণ্যের অবস্থান জানে ও সেই অনুযায়ী বিজ্ঞাপনের স্কিপ্ট বা কপি তৈরি করে যা কিনা ‘যোগাযোগ ও গণসংযোগ’ করতে সক্ষম। তাইতো এশিয়াটিক এমসিএলে বিজনেস স্কুল ব্যাকগ্রাউন্ডের ছেলে মেয়ে, আরও সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, মার্কেটিং যাদের মেজর সাবজেক্ট ছিল, তাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। বিশেষ করে ‘স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট’ বা ‘স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং’ এর ক্ষেত্রে তাদের ‘বিজনেস ব্যাকগ্রাউন্ড’ সম্পন্ন হওয়াটা এক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দান করে। এরা সাধারণত অ্যাডের মাপকাঠি বা কাঠামো প্রদান করে, আর আর্ট ডিরেক্টর পুরো অ্যাডটাকে পত্রিকার পাতায় বা টিভির পর্দায় ফুটিয়ে তোলে। এক্ষেত্রে স্ট্র্যাটিজিক প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্টের লোকজনের সাথে ক্রিয়েটিভ সেকশনের লোকজনের ভাল সমম্বয় থাকতে হয়। ‘পারফেক্ট টিমওয়ার্ক’ তাই এ ক্ষেত্রে জরুরি। ক্রিয়েটিভ সেকশনে অবশ্য ‘ফাইন আর্টস’ ব্যাকগ্রাউন্ডের লোকজনের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ভাল ‘গ্রাফিক্স ডিজাইন’ জানা দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকেরও এখানে চাহিদা যথেষ্ট। বিজ্ঞাপনী সংস্থায় চাকরির বিজ্ঞপ্তিগুলোতে খেয়াল করলেই দেখা যাবে, আগে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় (ছোট বা বড় যাই হোক) কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকলে এ নিয়োগে প্রাধান্য দেয়া হয়। ‘ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টরেরা বিভিন্ন ধরনের ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসে’, বললেন ওগিলভি এন্ড ম্যাথার বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পার্থ সালাহউদ্দিন। ‘এখানে সৃষ্টিশীলতা চর্চা করার উপযুক্ত সুযোগ তৈরি করে নিতে হবে। যে ছবি সুন্দরভাবে আঁকতে পারে, সে যে সুন্দর টিভি স্কিপ্ট তৈরি করতে পারবে এমন নয়। বরং আমরা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে ক্রিয়েটিভ লোক খুঁজে বের করি।’ কাজেই যারা দাবি করে তারা ক্রিয়েটিভ, তাদের সৃষ্টিশীলতা প্রমানের উপযুক্ত স্থান অ্যাডফার্ম।
এছাড়া মার্কেটিং ও সেলস-এ শিক্ষাপ্রাপ্ত এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোকদের এখানে ভাল চাহিদা রয়েছে। কারণ ক্লায়েন্ট কনভিন্সিং এর একটা ব্যাপার থেকেই যায় ভাইটাল পয়েন্ট হিসেবে। মিডিয়া সেকশনেও বিবিএ, এমবিএ পড়া বা স্ট্যাটিকটিকস-এ পড়া ছাত্রছাত্রীরা ভাল করে থাকে। আর স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং-এ মার্কেটিং বা হিউম্যান রিসোর্সে পড়া ছেলেমেয়ে, ভিজ্যুয়ালাইজার হিসেবে গ্রাফিক্স জানা ফাইন আর্টস এর লোকেরা এবং কপিরাইটার হিসেবে বাংলা ও ইংলিশ সাহিত্যের ছেলেমেয়েরা ভাল করছে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হল দেশে ব্র্যান্ডিং ও অ্যাডভারটাইজিং এর জন্য কোন ইনস্টিটিউট নেই। তবে, আশার কথা হলো গ্রে-এর গাউসুল আলম শাওন, অ্যাডকমের নাজিম ফারহান চৌধুরী, কোজিটোর রাজীবের মত লোকদের প্রচেষ্টায় এক বছরের মধ্যেই এই ধরনের ইনস্টিটিউট বাস্তবে রূপ নিতে পারে। তাহলে অ্যাডফার্মগুলো যেমন, দক্ষ ও উপযুক্ত লোক পাবে, তেমনি আরও ভাল ভাল কাজ এখান থেকে বের হয়ে আসবে।
বাংলাদেশে এখন দেশী-বিদেশি অনেক কোম্পানি তাদের পণ্য সামগ্রী নিয়ে আসছে। এর ফলে দেশের পণ্য সামগ্রীর মার্কেট বড় হচ্ছে। পণ্য সামগ্রী জনসাধারণের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়াটাই বিজ্ঞাপনের মূল্য উদ্দেশ্য। জনসাধারণ যে বিজ্ঞাপনটি পছন্দ করে দেখা গেছে যে পণ্য সামগ্রীটির বিক্রি বেশি হচ্ছে। বৈচিত্র্যময় বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণ করার পেছনে একটি বিজ্ঞাপন নির্মাতা কোম্পানির সকল বিভাগের কর্মীরাই অক্লান্ত পরিশ্রম করে।
**************************
মুহাম্মদ লুতফুল হক খান
ফটোঃ আনিসুজ্জামান
দৈনিক ইত্তেফাক, ২২ নভেম্বর ২০০৮।