বিদেশে বাংলাদেশকে অনেকেই চেনে দারিদ্র্য-দুর্নীতি-বন্যা আর অনিয়মের প্রতীক হিসেবে। বাংলাদেশ থেকে পড়াশোনা করে হার্ভার্ডে যাওয়া কেউ নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলতে গিয়ে হয়তো শোনে ‘বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় আছে!’
আবার এ দেশেরই ড. মুহাম্মদ ইউনূস যখন নোবেল পুরস্কার পান, তখন হয়তো তারা একটু অন্যভাবে ভাবতে শুরু করে। বাংলাদেশের কথা এলেই তারা ভাবতে পারে, ক্ষুদ্রঋণ কিংবা ইউনূসের ছবি। এভাবে একজনই বদলে দিতে পারেন একটা দেশের ছবি।
কে জানে, জ্যামাইকার চেয়ে হয়তো বব মার্লিকেই বেশি চেনে পৃথিবীর মানুষ। বিষয়টা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, উত্তম কুমার, আমাদের আশরাফুল কিংবা জুয়েল আইচ-সবার ক্ষেত্রেই সত্য। এমন উদাহরণ অনেক আছেন, যাঁরা তাঁদের নামের আলাদা অর্থ দাঁড় করিয়ে হাজার মানুষের ভিড়ে একটু আলাদা করতে পেরেছেন নিজেকে। তাঁদের কাজ ও যোগ্যতা দিয়ে অনেক সময় তাঁরা ছাপিয়ে যান তাঁদের প্রতিষ্ঠানকেও। প্রতিষ্ঠানের নামে তাঁদের নয়, বরং ব্যক্তির নামে প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিতে হয়। এ নামগুলোই ব্র্যান্ড। প্রতিষ্ঠান আর চারপাশ ছাপিয়ে নিজস্ব বা ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড।
সবার মধ্যে নিজেকে একটু আলাদা করার চেষ্টা আগেও ছিল। নিজস্বতা দিয়ে একটি আলাদা জায়গায় যাওয়ার বিষয়টি এখন আগে আগে আসছে প্রতিযোগিতার কারণেই। সাধারণ্যের ভিড়ে অসাধারণ হওয়ার এই দৌড়ে আছে কমবেশি সবাই। ছাড়িয়ে যাওয়ার এই তোড়ে কারও গণ্ডি দেশ ছাপিয়ে বিদেশে আর কারও হয়তো বা তার চারপাশটা ঘিরে। জানা বা অজানায় ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং এখন সময়ের ধারা।
নিজেকে একটু নতুন করে দেখতে হবে
নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরতে যা দরকার, আপনার মধ্যেই আছে তা। সব সাধারণ্যের ভিড়ে এমন স্বাতন্ত্র্য নিশ্চয়ই আছে আপনার, যা আপনাকে একটু তরুণ করে তুলে ধরবে।
আপনি যে কাজটি করছেন, সেটা হয়তো খুবই গৎবাঁধা। তার পরও সেখানে বিশেষ কিছু করার আছে নিশ্চয়ই। আপনার জায়গায় আপনার মতো আরও হাজার মানুষের ভিড় থাকতে পারে, একই সারিতে। সেখানেও নিজেকে একটু আলাদাভাবে তুলে ধরা যায়। নিজের এই ব্র্যান্ডিংয়ের পরিসরটা যে সব সময় বিরাট বড় হতে হবে, তা নয়, এই ব্র্যান্ডিং হতে পারে একজনের ছোট্ট চারপাশ ঘিরে। একটু আলাদা কিছু করতে পারলে হয়তো তিনজনের মধ্যে একজন হওয়া যাবে। এ সম্পর্কে ব্র্যান্ডজেল কনসাল্টেন্সি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতা শরিফুল ইসলাম বলেন, প্রত্যেকের মধ্যেই স্বতন্ত্র কিছু থাকে। এই স্বতন্ত্র জায়গাটা খুঁজতে হবে আপনাকেই। এরপর আপনার যুদ্ধ হবে সেই বিশেষত্বকে নিয়ে এবং নিজের জায়গায় থেকে এগিয়ে যাওয়া। এ জন্য বিশেষায়িত দিকগুলোতে অভিজ্ঞতা অর্জন করা যেতে পারে। তবে এ জন্য মূল কাজ বা জায়গা থেকে সরে গেলে হবে না। নিজেকে আলাদা করা মানে মূল জায়গা থেকে সরে আসা নয়। আসল কাজের প্রতি সৎ থাকতে হবে আগে। সেই কাজটির মধ্যেই নতুন কিছু খোঁজা যেতে পারে। ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য হয়তো অঘোষিত প্রতিশ্রুতির দরকার হতে পারে। সেই প্রতিশ্রুতি পালনে সততা আর স্বচ্ছতাই একজনের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংকে জোরালো করবে।
আপনার ব্র্যান্ডিংই এগিয়ে নেবে আপনাকে
রান্নাবান্না কিংবা খাবার বিক্রি করেন অনেকেই, কিন্তু বিরিয়ানি বা রান্নার কথা মনে হলে ফখরুদ্দীন বাবুর্চির কথাই আসে আগে। ছবি তো অনেকেই আঁকেন, কিন্তু জয়নুল কিংবা এস এম সুলতান হন কজন? বিশেষত্ব আর বৈচিত্র্যই তাঁদের কাজকে আলাদা করেছে। ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংই এগিয়ে নিয়ে গেছে তাঁদের। আপনার চারপাশে আপনার মতো অনেকেই হয়তো আছেন। সবার কাজই হয়তো অনেকটা একই রকম। তবে সেখান থেকেও কাউকে বেছে নেওয়ার প্রশ্ন এলে কোনো একটা মাপকাঠি নিশ্চয়ই থাকবে। এ মাপকাঠিতে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি না করতে পারলে পেশাজীবনে সাধারণের মধ্যে নিজেকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। নিজের অবস্থানের পরিবর্তনে ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংয়ের বিকল্প নেই। শুধু
পদোন্নতি নয়, কর্মজীবনের প্রতিটি ধাপে নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরার দরকার আছে। যার অবস্থান অন্যের তুলনায় যতটা ইতিবাচক, সে-ই এগিয়ে যাবে। শুধু নিজের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নয়, ব্র্যান্ডিং ছড়িয়ে দিতে হবে প্রতিষ্ঠানের বাইরেও। ব্যক্তিগত জীবনেও নিজের অবস্থান সুদৃঢ় ও পরিষ্কার করতে ব্র্যান্ডিংয়ের দরকার আছে। এ ব্যাপারে ঢাকা শিল্প ও বণিক সমিতির (ডিসিসিআই) সভাপতি হোসেন খালেদ বলেন, ‘ব্যবসায়ী আর পেশাজীবী বলে নয়, ব্র্যান্ডিং চাই সবারই। নিজের আলাদা একটা ছবি প্রত্যেককেই এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এ পরিচিতিটাই একজনকে তাঁর জায়গা করে দেবে।’
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের গণযোগাযোগ ও ব্র্যান্ড যোগাযোগ বিভাগের প্রধান আহসান উল্লাহ খান বলেন, ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং আসলে তাঁর নিজের পরিচায়ক। এটা দিয়েই তাঁকে আলাদা করা যায় পাশের জন থেকে। কোনো স্বীকৃতি বা পদোন্নতির বিচারকও এই ব্র্যান্ডিং। কাউকে কোনো জায়গায় বাছাই করা হয় ব্র্যান্ডিংয়ের ভিত্তিতেই।
ব্র্যান্ডিং মানে বদলে যাওয়া নয়
একেকজনের ব্র্যান্ডিং একেক রকম হয়। নিজেকে ভিন্ন জায়গায় দাঁড় করানো মানে এই নয় যে আপনার সবকিছু বদলে ফেলতে হবে। আপনার যা আছে, তা-ই ঠিক। এটাকে শুধু আলাদা করে দেখিয়ে দিতে হবে। আসলে নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলা যায় না কখনোই। কৃত্রিম কোনো গুণ আর সাজানো বৈচিত্র্য দিয়ে খুব বেশি দূর এগোনো যায় না। তখন বরং হিতে বিপরীত হওয়ার ভয় থেকে যায়। এ সম্পর্কে শরিফুল ইসলাম বলেন, প্রত্যেকের মধ্যেই কিছু অনন্যতা আছে। নিজের এই অনন্যতাকে চিনতে হবে সবার আগে। চেষ্টা করতে হবে এই অনন্য বৈশিষ্ট্য বা গুণ সামনে নিয়ে আসার। আর নিজের মূল জায়গায় ভালো করতে চেষ্টা থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিশ্রমের বিকল্প নেই।
নিজের যা আছে, তা নিয়েই চেষ্টা করতে হবে। বিষয়টা এমন নয় যে আপনি কাউকে আদর্শ মনে করে অনুসরণ করা শুরু করলেন। এটা একান্তই নিজের ভেতরকার একটা বিষয়। এখানে অন্যের প্রভাব বা বৈশিষ্ট্য আনলে হবে না। তবে কিছু কিছু অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা নিতে হবে; সেটাও নিজের জায়গায় থেকেই। এ জন্য নিজের মধ্যে কী আছে, তা সবার আগে জানতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে কোন দিকে তিনি বেশি ভালো, কিংবা কোনটা তাঁর কাছে স্বচ্ছন্দ লাগে। আসলে নিজের মধ্যে যা আছে, সেগুলো একটু গুছিয়েই আপনার ব্র্যান্ডিং করতে পারেন। শরিফুল ইসলাম বলেন, কাউকে বদলে দিয়ে ব্র্যান্ডিং হয় না। অন্তর্মুখী স্বভাবের কাউকে যদি বলা হয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বাড়িয়ে নিজেকে বদলে দিতে, তাহলে বিষয়টা তাঁর জন্য একটু বেশিই কঠিন হবে। যার যা সামর্থø আছে, সেদিকেই এগোতে হবে। চাপিয়ে দেওয়া কিছুর ভিত্তিতে ব্র্যান্ডিং হয় না।
উপস্থাপনাটাও জরুরি
আপনার অনন্যতা খুঁজে পেলেই কাজ শেষ নয়। সেই অনন্যতাকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করাটাই ব্র্যান্ডিং। এ উপস্থাপনাটাও হতে হবে নিজের মতো। বিষয়টা এমন না যে, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে নিজের ব্র্যান্ডিং করবেন আপনি; পণ্য আর প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডিংয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংয়ের ফারাক এখানেই। আপনার কাজই আপনার প্রচারণার বাহন। তবে এ জন্য কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা গণযোগাযোগের মাধ্যমে সাম্যের মধ্যে নিজেকে তুলে ধরতে হবে কৌশলে। এ জন্য একজন রাজনৈতিক নেতা যেমন গণসংযোগ করতে পারেন, তেমনি যে কেউই তাকে তুলে ধরতে পারে সময়ের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে। জীবনবৃত্তান্তে নিজের যোগ্যতাগুলো আলাদা করে যেমন উল্লেখ করা যেতে পারে, তেমনি ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট তৈরি করেও তুলে ধরা যেতে পারে নিজের বৃত্তান্ত। চারপাশটা দেখে ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও লক্ষ্য নিয়ে। সেই সঙ্গে জানতে হবে, কবে, কখন, কার সামনে আপনি আপনাকে উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। এ যোগ্যতা ও সামর্থø সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণার পর নিজের অনন্যতাকে ছড়িয়ে দিতে হবে। বুঝতে হবে, কোন দিকে এগোলে কৌশলে নিজেকে তুলে ধরা যাবে সঠিকভাবে। লক্ষ্য অর্জনে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি সহায়ক হবে সেগুলো চিহ্নিত করে নিজের কাজ ও আচরণে আলাদা কিছু ফুটিয়ে তুলতে হবে। এ জন্য সবার আগে দরকার যোগাযোগ ও সম্পর্ক উন্নয়ন। তবে মনে রাখতে হবে, নিজের অসাধারণ গুণগুলোর পাশাপাশি সাধারণ কিংবা মৌলিক গুণগুলোও যেন প্রকাশ পায়। যোগ্যতাকে সবার কাছে জায়গা মতো তুলে ধরতে হবে। এ জন্য নিজের জীবনবৃত্তান্ত বেশ কাজে আসতে পারে। চমৎকার ও আকর্ষণীয় এমন একটা জীবনবৃত্তান্ত ওয়েবে রেখে দেওয়া যেতে পারে। নিজের আলাদা ওয়েবসাইট না থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটেও রাখা যেতে পারে। কাজের ক্ষেত্র বাড়াতে হবে। এমন জায়গায় কাজ করার চেষ্টা করতে হবে, যেখানে নিজের যোগ্যতার পরিচয় দেওয়ার সুযোগ আছে। সব কাজের মধ্যেই নিজের প্রতি বিশ্বাস থাকতে হবে। ব্যক্তিগত আর সামাজিক যোগাযোগ বাড়াতে কাজে আসতে পারে প্রযুক্তি। ফেসবুকের মতো ভাচুêয়াল সমাজ নিজেকে তুলে ধরার নতুন সুযোগ করে দিয়েছে।
এখানে কোনো শেষ নেই
নিজের একটা ব্র্যান্ড দাঁড় করানো যতটা-না কঠিন, তার চেয়ে কঠিন সেটা ধরে রাখা। ব্র্যান্ডিং এক দিনের না, সময়ের সঙ্গে এটি জোরালো হয়। তাই নিজের বৈচিত্র্যকে মাথায় রেখে এগিয়ে যেতে হবে। এখানেও আপনার প্রতিযোগী থাকবে। একই ধরনের বিশেষত্ব নিয়ে আপনাকেও হয়তো ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে অন্য কেউ। এর মধ্যেও নতুন সুরে গেয়ে উঠতে হবে নিজের গান।
**************************
জাবেদ সুলতান পিয়াস
প্রথম আলো, ০৮ নভেম্বর ২০০৮