গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের চাকরি ও পেশার ক্ষেত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে। এ বদলের ধারা আগামী দিনগুলোতেও থাকবে। বিশ্বায়ন বা আন্তর্জাতিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে গেলে তবেই কাজের ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হবে। এসব নিয়ে বলেছেন প্রকৌশল, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, করপোরেট খাতের পেশাজীবীরা।
নকিব খান
সাপ্লাই চেইন পরিচালক, নেসলে বাংলাদেশ লিমিটেড
একটা সময় ছিল যখন পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারি চাকরির প্রতি ঝোঁক ছিল সবার। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই চিত্র বদলে গেছে অনেকটাই। এখনকার চাকরির বাজারে ছেলেমেয়েদের একটা বড় অংশ সরকারি চাকরির চেয়ে বেসরকারি চাকরির কথাই ভাবছে আগে। বেসরকারি চাকরির মধ্যে এ আগ্রহের কেন্দ্রে আছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এই পরিবর্তিত চিন্তা ও মানসিকতার মূলে আছে জীবনধারার বদলে যাওয়া স্রোত আর বিশ্বায়নের টান। বিশ্বায়নের কারণেই বাংলাদেশেও এই পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। বদলে যাওয়ার এ হাওয়া ব্যবসার ধরন থেকে শুরু করে পেশাজীবনে নানা মাত্রিক বৈচিত্র্য যোগ করেছে। বদলে গেছে জীবনধারা। বাড়ছে চাহিদা। সব মিলিয়ে আমাদের কাজের ক্ষেত্র ও পেশার ধরন-দুই জায়গায়ই বেশ পরিবর্তন এসেছে। এ পরিবর্তনের অনেকটাই হয়েছে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে। সব জায়গায়ই প্রযুক্তি, বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। কাজের সঙ্গে কর্মীর গতিও বেড়েছে। সাধারণ যোগ্যতার পাশাপাশি কর্মীদের আবশ্যক যোগ্যতার তালিকায় যোগ হয়েছে বিদেশি ভাষা, বিশেষ করে ইংরেজিতে পারদর্শিতা আর কম্পিউটারে দক্ষতা। সেই সঙ্গে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতাও বেড়েছে অনেক। এই প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেকে একটু আলাদা করে তুলে ধরার জন্য হলেও দরকার যোগ্যতার পরিচয়, দরকার নিজস্বতা, স্বাতন্ত্র্য। পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরেকটি পরিবর্তন বেশ চোখে পড়ার মতো। ভালো বেতনের বেসরকারি চাকরি ছেড়ে অপেক্ষাকৃত অনেক কম বেতনের সরকারি চাকরিতে যাওয়ারও উদাহরণ রয়েছে। এর অন্যতম কারণ চাকরির স্থায়িত্ব ও নির্ভরতা। আর এখন দেখা যায় অবস্থানের দ্রুত উন্নতির জন্য অনেকেই হরহামেশা চাকরি বদলাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্বল্প মেয়াদ আর স্থায়িত্বের বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে কমই। দেশে চাকরির ক্ষেত্র তথা পেশাগত বিষয়ে পরিবর্তন হয়েছে দ্রুত। পরিবর্তনের এই গতি বাড়ছে। ভবিষ্যতে এ ক্ষেত্রে আরও পরিবর্তন হবে, যেখানে মূল ভূমিকায় বিশ্বায়নের সঙ্গে থাকবে তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাব।
প্রকৌশলী তারিকুল হাসান
পরিচালক, ইপসিলন ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড
বর্তমানে চাকরির ক্ষেত্রে অনেক বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে এক বিষয়ে পড়াশোনা করে অন্য পেশায় চাকরি করত কিন্তু এখন কেউ যে বিষয়ে পড়াশোনা করছে সে বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত পেশাতেই সাধারণত চাকরি করছে। চাকরির নিয়োগদাতারাও অনেক বিকল্প প্রার্থী পাওয়ায় পেশা সম্পর্কিত পড়াশোনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। একটা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিলে অনেক আবেদনপত্র পাওয়া যায়, তাই নিজের পছন্দমতো নিয়োগ দেওয়া যায়। এখন আগের চেয়ে ভালো, মেধাবী, দায়িত্ব পালনের উপযোগী প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিনিয়তই বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়, তাই যেকোনো চাকরির জন্য ইংরেজি বিষয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠান বা দেশের স্বার্থেই চাকরিপ্রার্থীদেরও নয়টা থেকে পাঁচটা দায়িত্ব পালনের মানসিকতা বদলাতে হবে। এখনো চাকরির ক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। পেশাগত ক্ষেত্রে ভালো করার জন্য চাকরিপ্রার্থীদের উদার মানসিকতা, প্রাণশক্তিতে ভরপুর, দ্রুত পেশাগত দক্ষতা অর্জন করার মানসিকতা, সুন্দর বাচনভঙ্গি, যেকোনো বিষয় সহজভাবে দ্রুত আয়ত্ত করার ক্ষমতা থাকতে হবে, যা পড়াশোনা করা অবস্থায় শিখে নেওয়া উচিত। প্রকৌশল পেশায় স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তবে তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা, পোশাকশিল্পে অনেক বেশি ক্ষেত্র লক্ষ করা যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে চাকরির খাতে বৃদ্ধি পাবে। তবে এখন অনেক প্রকৌশলীকেই ব্যবসার দিকে ঝুঁকতে দেখা যাচ্ছে।
মঞ্জুরুল আলম
জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক, মানবসম্পদ বিভাগ, সিটি ব্যাংক লিমিটেড
চাকরির ক্ষেত্রে আজ থেকে ১০ বছর আগে যে অবস্থা ছিল, সে অবস্থা আর নেই। সরকারি চাকরি থেকে এখন বেসরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকে গেছে মানুষ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র হলো ব্যাংক ও টেলিযোগাযোগ। এর কারণ হচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠান অনেক সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। তবে দক্ষ মানবসম্পদের চাহিদাও বেড়ে গেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মানবসম্পদ তৈরি করছে। কিন্তু তারা যে মানবসম্পদ তৈরি করছে, তার মান যথেষ্ট প্রশ্নের সম্মুখীন। বিশেষ করে কিছু কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করছে। এর পরিবর্তে তারা যদি তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করে, তবে বাজার অনেক লাভবান হতো। কিছু মেধাবী বাইরে চলে যাচ্ছে আর আমাদের চাকরির বাজারে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান থেকে পেশাজীবীরা এসে কাজ করছে। আমাদের যে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, তাতে বিদেশি পেশাজীবীরা এসে কাজ করবে, তা আমরা সমর্থন করতে পারি না। আর পড়াশোনার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ-এসব বিষয়ে দক্ষতা বাড়ানো উচিত। আর যারা সদ্য স্মাতক তাদের প্রচুর যোগাযোগ (নেটওয়ার্কিং) করতে হবে।
হাবিবুল্লাহ এন করিম
সভাপতি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিশেন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন যেটা সেটা হচ্ছে, সবার মধ্যে একটা পেশাদারি মনোভাব দেখা যাচ্ছে। গত ১০ বছরে এর ফলে পেশাজীবীরা অনেক এগিয়ে গেছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসব পেশাজীবী তৈরি হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, আন্তর্জাতিক পেশাদারি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তারা কাজ করছে। ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ, প্রযুক্তিসহ অন্যান্য খাতে অনেক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। এরা একটি ভালো অবস্থান তৈরি করেছে। এরা আর শুধু বাংলাদেশের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি, বিশ্বমানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করছে। এ পরিবর্তনটা সামনের দিকে আরও বেশি দেখা যাবে। তাই এই প্রতিযোগিতা শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বাইরেও তারা একটি ক্ষেত্র তৈরি করছে। এটা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য ইতিবাচক। এরা আবার কয়েক বছর পরে যখন ফিরে আসবে, তারা পেশার মান ওপরের দিকে নিয়ে যাবে। আর দেশের তরুণরা যদি এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে, তাহলে এ ক্ষেত্রে আরও অগ্রগতি ঘটবে। আর বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে চাকরিপ্রার্থীদের নিজেদের মধ্যে বিশ্বমানের মনোভাব তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের যারা দেশে বা দেশের বাইরে কাজ করছে, তাদের করিগরি দক্ষতা কিন্তু খুবই ভালো। আর একটি বিষয়, পেশাজীবীদের কমিউনিকেশন স্কিল বাড়াতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। আর শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা বা প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগেও এই দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়ে অগ্রসর হতে হবে। আরেকটি বিষয়, ভষ্যিতে চাকরির বাজারে বড় একটি পরিবর্তন আসছে। বর্তমান আইটি সেক্টরে কাজ করছে প্রায় ৫০ হাজার লোক। এটা আগামী পাঁচ বছরে ১০ গুণ বেড়ে যাবে, সেখানে নতুন প্রজ্নের অবশ্যই একটি বড় ভূমিকা থাকবে।
ডা. এম এ রহমান
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, নিপসম, ঢাকা
আগে সবাই পড়াশোনা করত একটা লক্ষ্য নিয়ে। কিন্তু এখন চাকরিরই নিশ্চয়তা নেই, আগের মতো কেউ আর দায়বদ্ধতা নিয়ে সরকারি পেশায় আসছে না। চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে আগের মতো মেধাবীদের মূল্যায়ন করা হয় না। চাকরির ক্ষেত্রে যে অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়, তার জন্য ছাত্রাবস্থাতেই পড়াশোনাসম্পর্কিত চাকরিগুলো যেমন-এনজিওতে কাজ করা যেতে পারে। এখন চাকরির ক্ষেত্র কম, কিন্তু অভিজ্ঞ লোক পাওয়া যায় অনেক। কারণ এখন চাকরির ক্ষেত্র পরিবর্তনের সুযোগ থাকায় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোক পাওয়া যায়। যেকোনো চাকরির ক্ষেত্রে এখন যে বিষয়গুলো দেখা হয় তা হলো, যে পেশায় চাকরি করবে সেই বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান। অতীতে চাকরির ক্ষেত্র প্রসারিত থাকায় অভিজ্ঞতার প্রতি এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো না, কিন্তু এখন ক্ষেত্র কম থাকায় অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। ভবিষ্যতে তৈরি পোশাকশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা খাতে পেশা গড়তে যথেষ্ট মেধাবী হতে হবে এবং খুবই উন্নত মানসিকতার অধিকারী হতে হবে। এখন পাস করা ডাক্তারেরা বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বেশি আগ্রহী হচ্ছে। কারণ সেখানে আর্থিকভাবে বেশি লাভবান হওয়া যায়। তার পরও সরকারি ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা থাকে সবারই।
**************************
গ্রন্থণাঃ আরাফাত শাহরিয়ার
প্রথম আলো, ০৮ নভেম্বর ২০০৮