চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি (সিএ) সম্ভাবনাময় একটি পেশা। বাংলাদেশে তো বটেই, যেকোনো দেশেই সিএ পাস করা ব্যক্তির চাকরিতে অবস্থান ও বেতন অনেকটা উঁচুতে নিঃসন্দেহে। কিন্তু ওই পর্যায়ে যেতে হলে লাগে অসীম ধৈর্য ও সামাজিক সহযোগিতা; বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া আমাদের দেশে সহজ নয়। আর মেয়েরা এ ক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে। ২৫ অক্টোবর ঢাকায় একটি সেমিনারে এমন মতই দিলেন বিশেষজ্ঞ আর অভিজ্ঞরা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটঃ বর্তমানে দেশে সিএ শিক্ষার্থী (আর্টিকেল স্টুডেন্ট) মোট দুই হাজার ৮১৭ জন। এর মধ্যে দুই হাজার ৪৪০ জন ছাত্র ও ৩৭৭ জন ছাত্রী। শতাংশ হিসাবে ছাত্রীদের এই হার ১৩.৩৪, যা নিতান্তই নগণ্য। শ্রীলঙ্কায় এই হার ২৫, পাকিস্তানে ৩ এবং ভারতে ১৪ শতাংশ। বাংলাদেশে নারী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের সংখ্যা মাত্র ২৪ জন। তবে এখন ধীরে হলেও সিএ পড়ার ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। সিএ ফার্ম একনাবিন নারীদের সিএ পেশায় উৎসাহ দিতে এই সেমিনারের আয়োজন করেছিল। ‘পেশাজীবনে সম্ভাবনা’ শীর্ষক ওই সেমিনারে উল্লেখ্যযোগ্যসংখ্যক নারী সিএ ও শিক্ষার্থী অংশ নেন। বাংলাদেশের প্রথম নারী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট সুরাইয়া জান্নাত খান এবং দ্বিতীয় নারী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট পারভীন মাহমুদ বক্তৃতা করেন এতে। এ ছাড়া একনাবিনের প্রতিষ্ঠাতা ও অংশীদার এ বি এম আজিজউদ্দিনসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন এ আয়োজনে। সিএ পেশার নানা দিক নিয়ে তাঁরা আলোচনা করেন।
কেন এই বাধাঃ কম সংখ্যায় মেয়েদের সিএ পড়তে আসার ব্যাপারটা এখন সাধারণ ব্যাপারেই পরিণত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ছেলেদের অংশগ্রহণও যে একটা পর্যায়ে গিয়ে ধাক্কা খায় না তা নয়। তাদের সংখ্যার হার যে কমে না তা নয় ; কিন্তু সেটি মেয়েদের তুলনায় কম এবং পড়া মাঝপথে ছেড়ে দেওয়ার কারণও স্বল্প। স্মাতকোত্তর শেষ হওয়ার পর আরও তিনটি বছর লেগে যায় সিএ পড়া শেষ করতে। এ সময় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বের পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হয়। মেধা ও মনোযোগের পাশাপাশি দরকার হয় ধৈর্যের। নারীদের জন্য তা আরও অত্যাবশ্যকীয়, কারণ এর মধ্যেই বেশির ভাগ মেয়ে পদার্পণ করে বিবাহিত জীবনে। সংসার সামলে তিনটি বছর পড়াশোনার জন্য অতিরিক্ত সময় দেওয়াটা অনেকাংশে দাঁড়ায় বাধা হয়ে। এ ছাড়া অনেকে পেয়ে যান চাকরির লোভনীয় প্রস্তাব, যা থেকে সরে আসা যায় না। সেটা ছেলেদের ক্ষেত্রেও হয়। চাকরি-পড়াশোনা একসঙ্গে চালানো অনেক সময়ই হয়ে যায় কষ্টসাধ্য। কারণ, সিএ পড়া নয়টা-পাঁচটা অফিস করার মতোই। সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত পড়াশোনা ছাড়াও শিক্ষানবিশ হিসেবে চুক্তিবদ্ধ শিক্ষার্থী (আর্টিকেল স্টুডেন্ট)বাইরে গিয়েও অফিসের নানা কাজ করতে হয় এবং পাঁচটার পর তো লাইব্রেরিতে পড়াশোনা আছেই। বাসায় ফিরতে তাই মাঝেমধ্যে এমনকি রাতও হয়ে যায়।
পড়তে পড়তে ছেড়ে দেওয়াঃ সেদিনের সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন এমন অনেকেই যাঁরা সিএ কোর্সের মাঝপথে এসে ছেড়ে দিয়েছেন পড়াশোনা।একেকজনের ক্ষেত্রে কারণটা একেক রকম হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কাজ করছে পারিবারিক দায়িত্ববোধ, চাকরি পেয়ে যাওয়া, অমনোযোগী হয়ে যাওয়া, ধৈর্য হারিয়ে ফেলা অথবা হীনম্মন্যতায় ভোগা।
ছেলেমেয়ে কোনো ভেদাভেদ নেই, তবে সিএ পড়ার ক্ষেত্রে সময় দেওয়াটাই মুখ্য। সামাজিক-পারিবারিক কিছু দায়িত্ব মেয়েদের ঘাড়েই বেশি।তাই চারদিকের সবকিছুতে সমতা বজায় রেখে পড়াশোনাটা চালাতে হয়। এটি কষ্টসাধ্য হলেও অসম্ভব নয়।
আবার পরীক্ষায় প্রথমবার কৃতকার্য না হয়ে অনেকে ডুবে গেছেন হীনম্মন্যতায়, হারিয়ে ফেলেছেন ধৈর্য। প্রয়োজন এখানে সাহসিকতা ও একাগ্রতার। মাঝখানে লক্ষ্য থেকে সরে গেলেও ১২ থেকে ১৪ বছর পর পাস করে কয়েকজন পূরণ করেছেন লক্ষ্য। তাঁদেরই একজন ফৌজিয়া হক। তিনি বলেন, ‘চাকরিতে ঢোকার পর পড়ার ইচ্ছেটা অনেকাংশে চলে যায়। তখন চাকরিকে বেশি প্রাধান্য দিলে এ বিষয়ে পড়া আর হয়ে ওঠে না। সামাজিক বাধাগুলোকেও ধৈর্য আর সাহসের সঙ্গে অতিক্রম করা সম্ভব। জীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রাধান্য দেওয়া সম্ভব, যদি পড়ার ব্যাপারে থাকে একাগ্রতা।’
এখন যাঁরা পড়ছেনঃ একনাবিনে যুক্ত হয়ে যেসব মেয়ে সিএ পড়ছেন, তাঁদের প্রায় সবাই স্মাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে পড়তে এসেছেন। দু-একজন উচ্চমাধ্যমিকের পর ভর্তি হয়েছেন এখানে। সম্ভাবনাময় এই বিষয়ে পড়ার ইচ্ছে সবার থাকলেও পাস করা হয় না অনেকের। এ ক্ষেত্রে তাঁরা অন্যান্য বাধার সঙ্গে সামাজিক পারিপার্শ্বিকতাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন বেশি, ‘মাস্টার্সের পর তিনটা বছর অতিরিক্ত লেগে যায়। এই সময়টাতেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে বেড়ে যায় দায়িত্ব। পরিবার থেকে সহায়তা না পেলে আর পড়া যায় না।’
অনেক সময় পরিবারকে বোঝানোর পরও বুঝতে চায় না সন্তান, স্বামী। এ সবকিছুই একসময় পড়ার মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এখানে দরকার সামাজিক চিন্তাধারার পরিবর্তন ও সহযোগিতা। যেখানে সব ক্ষেত্রে মেয়েরা এগিয়ে এসে প্রমাণ করছে তাদের যোগ্যতা, সেখানে শুধু সময় বাধা হয়ে দাঁড়াবে-এটি তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য।
এ বিষয়ে কম প্রচারণাও শিক্ষানবিশ হিসেবে চুক্তিবদ্ধ ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণের স্বল্পতার অন্যতম কারণ হিসেবে বললেন অনেকেই। বেশির ভাগ মানুষই জানেন না বা বোঝেন না চাকরির সম্ভাবনার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব। রোমানা আহমেদ বলেন, ‘আমি যখন এখানে ভর্তি হই, তখন মাত্র চারজন ছিল আমার সঙ্গে। ধীরে হলেও এখন সংখ্যা কিছুটা বাড়ছে।’
দরকার মেয়েদের এগিয়ে আসাঃ দেশের প্রথম নারী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট সুরাইয়া জান্নাত খান এখন সিনিয়র ফিন্যানশিয়াল ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট হিসেবে বিশ্বব্যাংকে কাজ করছেন। তিনি জানান, একসময় মনে করা হতো বিষয়টি শুধু পুরুষদের জন্য। কিন্তু সেটা এখন আর সত্য নয়। পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েরাও এখন অংশগ্রহণ করে রাখছে যোগ্যতার প্রমাণ। তিনি আরও বলেন, কঠোর পরিশ্রম, একাগ্রতা আর লক্ষ্য ঠিক থাকলে এই বিষয়ে পড়া শেষ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা যায় একটি উচ্চতর পর্যায়ে।
পল্লী কর্মসংস্থার উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভীন মাহমুদ বলেন, ‘যেকোনো করপোরেট খাত, ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থা ও এনজিওতে চাকরির ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। একমাত্র সময়ের সুষম বণ্টনই সহায়তা করবে দ্রুত পড়া শেষ করার ক্ষেত্রে।’
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও সচেতনতা বৃদ্ধি সিএ পড়ায় সবার অংশগ্রহণ বাড়াবে বলেই মনে করছেন সবাই।
**************************
রয়া মুনতাসীর
প্রথম আলো, ০১ নভেম্বর ২০০৮