সাইপ্রাস গমন এখন আর ফলপ্রসু কিছু নয়
- By Career Poster
- Published 06/7/2008
- বিবিধ
- Unrated
বিশেষত সাম্রাজ্যবাদী পররাষ্ট্রনীতি ও ক্ষমতাবলে সাইপ্রাসের ভৌগোলিক অবস্থান দুই ভাগে বিভক্ত। একটি ইউরোপিয়ান সাইপ্রাস, যা গ্রীস পর্সনে সংলগ্ন। আর অন্যটি তুর্কি সাইপ্রাস, যা তুর্কি সীমান্ত সংলগ্ন। মূলত শীত প্রধান দেশ এটি। বছরের ৭/৮ মাস-ই শীত এবং বাকী ৪ মাস প্রচুর গরম। লোক সংখ্যা অধিকাংশই ট্যুরিস্ট। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও আশেপাশের ভ্রমন বিলাসী লোকজন অবকাশ যাপনের লক্ষ্যে বাড়ী বা ফ্ল্যাট ক্রয় করে,কেবল অবসর সময়টা ওখানে কাটানোর উদ্দেশ্যে। ট্যুরিজম উপযোগী বিভিন্ন সিজনে এখানে ট্যুরিস্টদের ভীড় লেগেই থাকে। দেশটি সমুদ্র বেষ্টিত একটি দ্বীপ হওয়ায় পর্যটকদের এত পছন্দের এটি। ফলে এর সার্বিক অর্থনীতি, বিনিয়োগ অধিকাংশই ট্যুরিজম ভিত্তিক। ভাষা ইংরেজি। এখানে হোটেল ম্যানেজমেন্ট সাবজেক্টকে ঘিরে ট্যুরিজম ভিত্তিক অনেক কলেজ ইন্সটিটিউট এবং বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলেরও উচ্চ শিক্ষার ভালো সুযোগ রয়েছে। আছে অন্যান্য বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও। পর্যটনকে কেন্দ্র করে অনেক হোটেল-মোটেল এবং রেস্তোরা থাকায় রয়েছে ফুল ও পার্টê টাইমের ভালো কাজের সুযোগ। কারেন্সি মূলত সাইপ্রাস পাউন্ড ও ইউরো। তবে অন্যান্য দেশের পাউন্ডও প্রচলিত। তাই উপার্জনও খারাপ নয়। ফলে দেশটিতে তৃতীয় বিশ্বের লোকজন, বিশেষত বাংলাদেশ, ভারত,পাকিস্তান ও আরো কিছু দেশের তরুন, বয়স্করাও একসময় ছাত্র ভিসায় ওখানে যাওয়ার হিড়িক ছিল এবং এখনও যাচ্ছে। তবে লেখাপড়া বলতে এখন হোটেল ম্যানেজমেন্ট ভিত্তিক পড়াশুনাটি ওখানে মানসম্পন্ন। ফলে এর বাইরে অন্য কোন বিষয়ে লেখা পড়া অন্ততঃ এখন আর খুব একটা মান সম্পন্ন নয়। আসলে অধিকাংশই যায় ছাত্র নাম করে চাকুরীর জন্য। এভাবে যেতে যেতে এক সময় যখন ওদের প্রশাসন দেখলো ছাত্র নাম করে চাকুরী প্রার্থীর সংখ্যাই বেশি,তখন বিষয়টিতে কড়াকড়ি শুরু হলো। বাংলাদেশে সাইপ্রাসের কোন দূতাবাস নেই। তবে এখন কেবল অনারারি কনস্যুলেট অফিস আছে। এক সময় এটাও ছিলনা। তখন অনারারী কনস্যুলেট জিএমজি অফিসে ভিজিটর হিসেবে বিভিন্ন মেয়াদে এসে ইন্টারভিউর মাধ্যমে ছাত্র ভিসা দিয়ে যেত। আর সাইপ্রাসেও আমাদের কোন ডিপ্লোমেটিক মিশন নেই। তো ছোট এই দ্বিপটিতে ছাত্র ভিসার নামে চাকুরী প্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় জব আর সচরাচর নেই। নেই ভালো থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাও। নিরাপত্তার দিক থেকেও দেশটি এখন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। ভিনদেশীরা বাংলাদেশীদের উপর বিভিন্ন নির্যাতন করে। আর স্থানীয়রাও সুযোগ পেলেই আক্রমনাত্মক ব্যবহার করে এবং পুলিশে অভিযোগ করে। ওখানে মেয়েরা পুলিশে অভিযোগ করলে রক্ষা নেই! তবু এরই মধ্যে যারা কষ্টে - শিষ্টে টিকে আছে, তারা একরকম লুকিয়ে জব করে। এরা প্রায়ই পুলিশের তাড়া খায়। ধরা পরলে যত দ্রুত সম্ভব বিমানে উঠিয়ে তারপর নিস্তার। ওখানে অধিকাংশ ছাত্র ভিসাই সাধারণতঃ এক বছরের হয়। ফলে এক বছর পার্ট টাইম জব করে কিছুই হয় না বিধায় মেয়াদ উত্তীর্নের পর লুকিয়ে থাকতে হয়। একসময় ইউরো সাইপ্রাস থেকে ইউরোপে প্রবেশ করা গেলেও এখন তাও সম্ভব নয়। ফলে অন্যান্য দেশ থেকে এখন ওখানে লোক খুব একটা যাচ্ছে না। এখন প্রশ্ন সাইপ্রাস কর্তৃপক্ষ ভিসা দেয় কেন? আসলে কনসিউলেট ভিসা দিচ্ছে ফরেণ কারেন্সির উন্নতির দিকে তাকিয়ে। তাছাড়া তারা সার্বিকভাবে এতটা অবগত নয় যে, ছাত্র ভিসার নাম করে বেশিরভাগই গা ঢাকা দিয়ে কাজ করে। তবে এখন তারা বিষয়টিতে অবগত হলেও ভিসা দেয়া অব্যহত রেখে পুলিশি তল্লাশী ও তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে। ভিসা দেয়ার ব্যপারে কড়াকড়ি করছেনা ফরেণ কারেন্সির প্রশ্নে। তবে পুলিশ অত্যন্ত তৎপর। অবৈধদের পেলেই বের করে দেয়।
এই লেখার সুবাদে সাইপ্রাস ফেরত অনেকের সাথেই কথা হয়। জানা যায় তাদের নানামুখি অভিজ্ঞতা,অভিপ্রায় সম্পর্কে। মানুষ স্বভাবগতভাবেই চূর্ণ হওয়া স্বপ্নগুলোর ভগ্নাংশে দাঁড়িয়ে থেকেই আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। যেমনটি ঘটছে বিদেশ ফেরত অনেকের ক্ষেত্রে। এরা বিভিন্ন দেশে, বিশেষত সাইপ্রাসে শত কষ্ট-ক্লেশ করা সত্ত্বেও দেশে ফিরে পুনরায় চেষ্টা করছে অন্যত্র যাওয়ার। অন্যত্র বলতে সাইপ্রাসে যাওয়ার হিড়িক কেন? আসলে অনেকেই ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ছাত্র ভিসায় ইউরোপ-আমেরিকায় যেতে চাইলেও কতিপয় কনসালটেন্সি ফার্মের উপর আস্থা রেখে তাদের পরামর্শ মতে এক পর্যায়ে সাইপ্রাস যাচ্ছে। ঐসব ফার্ম বলছে সাইপ্রাস গেলে সহজেই ইউরোপে প্রবেশ করা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ইউরোপ যাওয়াতো দূরে থাক, ওখানেই থাকতে পারছে না এবং এক পর্যায়ে অনেক তিক্ততা ও শূন্যতাকে সাথে নিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছে। তো এই ফিরে আসাদের অনেকের মুখেই তাদের ফিরে আসার মর্মস্পর্শি বর্ণনা শুনলেও,সম্প্রতি ফিরে আসা শিক্ষার্থী আনিসুর রহমান আনিসের কাহিনী সাবাইকে হার মানিয়েছে।আনিসের ইচ্ছা ছিল ইউকে যাবে। কিন্ত সে বছর দুই পূর্বে এক কসনসালটেন্সি ফার্মের পরামর্শে সাইপ্রাস যায়। তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল এই মর্মে যে; সাইপ্রাস থেকে সহজেই ইউকে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু বিধিবাম,সাইপ্রাস যাওয়া হলেও বহু চেষ্টা চরিতার্থের পরও তার ইউকে আর যাওয়া হয় না। শেষ পর্যন্ত শূন্যাবস্থায় ফিরতে হয় দেশেই। অবশ্য এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। পরিসংখ্যান মতে শতকরা ৪-৫জন সাইপ্রাসে ভাল অবস্থায় আছে; হোটেল ম্যানেজমেন্টে উন্নত পড়াশুনা ও অভিজ্ঞতা হেতু ভাল জব প্রাপ্তির ফলে।
**************************
মঞ্জুর মোরশেদ
দৈনিক ইত্তেফাক, ৭ জুন ২০০৮